বিবর্তন!

Posted: April 21, 2011 in Uncategorized

Advertisements

অবশেষে পশ্চিমবঙ্গে আরো একটা বিধানসভা নির্বাচনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমরা। মিডিয়া থেকে শুরু করে ব্যাপক জনমানস সমস্ত জায়গাতেই একটা ফাইনাল ম্যাচের গন্ধ আর রাজ্যের আবহাওয়া জুড়ে ‘পরিবর্তনের’ পূর্বাভাস। পরিবর্তনের এই হাওয়ায় তৃতীয় শিবিরের (সাম্রাজ্যবাদ-সামন্তবাদ-বৃহৎ পুঁজিবিরোধী ও সরকারনির্ভরশীলতার রাজনীতির বিরোধী শিবির) সাধারণ ন্যূনতম অবস্থানটুকুও ভেসে যেতে বসেছে বানের জলে। এতকাল ধরে ঘোর ভোট-বয়কটপন্থী থেকে শুরু করে সাধারণ ভাবে সংগ্রামী বাম অবস্থানে থাকা বহু মানুষ তথা বুদ্ধিজীবিরা নেমে পড়েছেন মার্ক্সের ভূতকে নামিয়ে এনে তাঁর মুখ দিয়েই বলাতে— যে কেন এবারে তৃণমূলকেই ভোট দেওয়া উচিত। উল্টো অবস্থানও তৈরী হয়েছে— সিপিএমকে ভোটদানের, এবং আবারও ‘বিপ্লবী’ শব্দবন্ধের মাধ্যমে ন্যায্যতা তৈরী করেই।

আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন কে ঘিরে যে বক্তব্যটি বুদ্ধিজীবি মহলে প্রাথমিকভাবে বৈধতা পেয়েছে তা হল এবারের বিধানসভা নির্বাচনটি আসলে গুণগতভাবে পৃথক একটি ঘটনা। এই বক্তব্যের মূল তাত্ত্বিক কারণ হিসেবে হাজির করা হয়েছে গত ৩৪ বছরে সিপিএম এর শাসন পশ্চিমবঙ্গে এক নতুন সামাজিক দ্বন্দ্বের জন্ম দিয়েছে—তা হল ফ্যাসিবাদী সিপিএম বনাম শোষিত জনসাধারণ। তাই এই সামাজিক ফ্যাসিবাদী সিপিএম কে হঠাতে বাকি সকলের সাথে হাত মেলাতে হবে। প্রথমত: এটা বলে রাখা দরকার, সিপিএম নিয়ে কোনো নরম অবস্থান নেবার কারণ নেই— আমরা নেবার পক্ষপাতী-ও নই। মেহনতি মানুষের সাথে এমন নির্লজ্জ বিশ্বাসঘাতকতা করে যারা জনগণের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে— জনগণের লড়াই-আন্দোলনের বড় শত্রু তারা। কিন্তু ‘ফ্যাসিবাদ’ শব্দটি তো একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অর্থ বহন করে চলে। সিপিএম ‘অত্যাচারী’, সিপিএম ‘একদলীয় শাসন কায়েম করেছে’—এসবই সত্যি। কিন্তু ‘ফ্যাসিবাদী’ বললে উত্তর দিতে হবে আরও কিছু প্রশ্নের— আচ্ছা কেরালার সিপিএমও কি ‘ফ্যাসিবাদী’, নাকি শুধু পশ্চিমবঙ্গের সিপিএম? পশ্চিমবঙ্গে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের গণআন্দোলনকে যে আক্রমণের মুখোমুখি হতে হয়েছে— ভারতের অন্য কোনো রাজ্যের গণআন্দোলনকে (ধরুন-জগৎসিংহপুরে(পস্কো), কিংবা কলিঙ্গনগরে, কিংবা রায়গড়ে কিংবা খাম্মামে) কি এর চেয়ে কম অত্যাচারের সম্মুখীন হতে হয়? কংগ্রেস বা বিজেপি যে রাজ্যে শক্তিশালী কিংবা ধরুন, বিহারে লালু কিংবা নীতিশ কুমাররা, ওড়িশায় নবীন পট্টনায়করা, পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে মানুষকে বেশি গণতন্ত্রের আবহে রেখেছেন কি? আচ্ছা ভারতরাষ্ট্র কি একটি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র ? মরনোন্মুখ পুঁজিবাদের ঠিক কি পর্যায়ের জন্য ভারতে ফ্যাসিবাদের জন্ম? কেনই বা তা অন্যান্য দল থাকতে ‘সিপিএম’-এর মধ্যে দিয়েই মূর্ত হলো ? দেখুন, সিপিএম যে অতিবজ্জাত তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সিপিএম-এর রাজনৈতিক স্বরূপ উদঘাটনের জন্য যাবতীয় কর্মকান্ড অত্যন্ত জরুরী। এমনকি গায়ের ঝাল মেটাতে সিপিএমকে আরো দশটা গালাগালও দিতে পারেন— কিন্তু তৃণমূলকে ভোট দেওয়ার যুক্তিও সাজানোর জন্য ‘ফ্যাসিবাদ’ শব্দটার ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্যকে বিসর্জন দেওয়া যাবেনা । দ্বিতীয়ত: সিপিএম যদি সমাজের বিভিন্ন স্তরে, একটা বড় অংশের মানুষের মনে বৈধতাসহ সত্যিই এক ফ্যাসিবাদের জন্ম দিতে পেরে থাকে, তবে তার সমাধান ভোটের মাধ্যমের হবে কিভাবে?

আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে মিডিয়ার হাত ধরে এক দ্বিত্ববিভাজনের রাজনীতি সমাজের বুকে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। দ্বিত্ববিভাজনের রাজনীতির এই প্রচার এবং প্রসার সমাজের নানাস্তরের সাথে এসে আমাদের বিপ্লবী শিবিরকেও কমবেশি নাড়িয়ে দিয়েছে। একপক্ষ বলছে সিপিএম স্বৈরাচারী, অগণতান্ত্রিক এবং সিপিএম এর অগনতান্ত্রিকতাকে বিরোধিতার একমাত্র রাস্তা তৃণমূলকে ভোট। আবার উল্টোদিকের বক্তব্য তৃণমূল-কংগ্রেস জোট এক দক্ষিণপন্থী-নৈরাজ্যবাদী উত্থান এবং তাকে বিরোধিতা করতে হলে, করতে হবে বামফ্রন্টকে ভোট দিয়ে। তৃণমূলকে ভোট দেবার কথা যেসব ‘বিপ্লবী’-রা বলছেন তাদের যুক্তি থাকছে—‘তৃণমূল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্যে দিয়েই উঠে এসেছে’, ‘তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিকশিত হবার সুযোগ বাড়বে’, ‘তৃণমূল সিপিএম-এর মতো রেজিমেন্টেড সংগঠন নয়, তৃণমূলের কোনো লিখিত কর্মসূচি নেই’, ‘জনগণের প্রত্যাশার চাপের জন্য তৃণমূলকে কিছু জনকল্যাণমূলক কাজ করতেই হবে’, ‘তৃণমূল এখনই শাসকশ্রেণীর দলে পরিণত হয়নি’— এরকম নানা যুক্তিকে আলাদা করে আলোচনার প্রয়োজন থাকলেও এ লেখায় তার অবকাশ নেই। তবু বলা যায়— যে সিপিএম এর একনায়কতন্ত্র নিয়ে আজ প্রশ্ন, ১৯৭৭ এর বিধানসভায় ব্যাপক কংগ্রেস বিরোধী হাওয়াকে কাজে লাগিয়ে বিপুল সংখ্যক জনগণের স্বতস্ফুর্ত সমর্থন ও অংশগ্রহনের মাধ্যমেই তার সিংহাসনে অভিষেক হয়েছিল, গণআন্দোলনের ধারাবাহিকতাতেই। সিপিএম এর মতো রেজিমেন্টেড সংগঠন না হয়েও, তত সুস্পষ্ট লিখিত কর্মসূচি না থেকেও এবং দলের মধ্যে হাজার একটা লবি নিয়েও গোটা দেশের সরকার দিব্যি চালাচ্ছে কংগ্রেস—শাসকশ্রেণীর কর্মসূচি রূপায়নেও কোথাও অসুবিধা হচ্ছে না তার। আসলে তো এ সমাজে শাসকশ্রেণী তার মতো করে সমাজটাকে ঢেলে সাজায় প্রতিনিয়ত— আর তাই নিজের কর্মসূচি না থাকার অর্থ, সরকারে গিয়ে শাসকদের কর্মসূচি রূপায়িত করা—ঠিক যা করবে তৃণমূল সরকারে এলে।

অনেকে এই সরকারের পতনের প্রশ্ন কে এভাবে হাজির করছেন যে— যেহেতু ‘নিরপেক্ষ’ বলে কোনো অবস্থান হয় না, তাই এই পরিস্থিতিতে তৃণমূলকে সমর্থন না করার অর্থ সিপিএম কে সমর্থন করা, সিপিএম-এর ৩৪ বছরের শাসনকে দীর্ঘায়িত করা। কথা হলো, নিরপেক্ষতা সত্যিই হয়না। কিন্তু কিসের ভিত্তিতে পক্ষ নেবো? সমাজে খেটে খাওয়া মানুষের মুক্তির প্রশ্নের ভিত্তিতে, নাকি দলভিত্তিক রাজনীতির প্রেক্ষিতে? প্রথম দিক থেকে দেখলে তো সিপিএম আর কংগ্রেস-তৃণমূল একটাই পক্ষ, আর অবস্থান নিতে হবে আর নেওয়াতে হবে এই পক্ষটার বিরুদ্ধেই। তৃণমূলের কংগ্রেসী উত্স নিয়ে প্রশ্ন না তুলেও বলা চলে ইতিমধ্যে পঞ্চায়েত কিংবা পুরসভা যে স্তরেই সে ক্ষমতা দখল করেছে সেখানে সেই ক্ষমতা আর যাই হোক কোনোরকম গণসংগ্রাম বা আন্দোলন বিস্তারের কাজে ব্যবহৃত হয়নি, উল্টে লাগামছাড়া দুর্নীতি আর দুর্নীতির বিরোধী স্বরকে দমনের কাজেই লেগেছে। কংগ্রেসের সাথে তৃণমূলের দ্বন্দ্ব যে আসলে কি— তার প্রমান আমরা পাই যখন দেখি ২০০৩ সালে বিধাসভায় SEZ আইন পাশ হয়ে যায় তৃণমূলের সম্মতিক্রমে। কংগ্রেসের একের পর এক জনবিরোধী শিক্ষানীতির বিলে সিলমোহর দেন তৃণমূলের ২১জন এমপি। শুধু ঝামেলা বাধে নির্বাচনে আসন ভাগাভাগি নিয়ে!

উল্টোদিকে এই সামাজিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তথাকথিত ‘বিপ্লবী’দের একটা অংশ আবার সিপিএম কে সমর্থনের যুক্তিতে দাঁড়িয়েছে। তাদের বক্তব্য তৃণমূলের উত্থানের মধ্যে দিয়ে রাজ্যে এক দক্ষিণপন্থী শক্তির ব্যাপক প্রসারের সম্ভাবনা রয়েছে। সুতরাং সেই সম্ভাবনাকে প্রতিহত না করতে পারলে ভবিষ্যতের বাম আন্দোলনের বিকাশ প্রায় অবরুদ্ধ। আর প্রতিহত করার জন্যই নাকি অষ্টম বামফ্রন্ট সরকার গড়ার লক্ষ্যে ভোট। এতদূর না এগোলেও অনেকেই তৃণমূল নিয়ে যতটা কঠোর অবস্থান নিছেন সিপিএম নিয়ে ততটা কঠোর অবস্থান নিছেন না। প্রশ্নও হল, কোনো দল বামপন্থী না দক্ষিনপন্থী তা ঠিক হবে কি দিয়ে— ঝান্ডার রং দিয়ে, নাকি কাজ দিয়ে ? গত ৩৫ বছরে ‘বামআন্দোলনের’ নামে দেশী-বিদেশী মালিকদের দালালি করে পশ্চিমবঙ্গের গণআন্দোলনের যে ক্ষতি সিপিএম তথা বামফ্রন্ট করেছে, তাতে ভোট তো দূরঅস্ত ভবিষ্যতেও কোনো গণআন্দোলনের স্তরেই সে আর সমর্থনযোগ্য বা বিশ্বাসযোগ্য সঙ্গী নয়। বরং সিপিএম এর উদাহরণের মাধ্যমে আমাদের স্বরূপউন্মোচন করতে হবে সরকারনির্ভরশীল বাম-রাজনীতির পরিণতির, বলতে হবে একটি সাংসদীয় বামদলের শাসকদলের প্রতিনিধিতে পরিণত হবার কাহিনী।

আসলে, ২০১১-র বিধানসভা নির্বাচনও মূলগতভাবে আর একটি নির্বাচন প্রক্রিয়াই, যা কিনা ‘পরিবর্তনের’ নামে সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতি মানুষকে আরো আস্থাভাজন করে তুলবে। সমস্যা হচ্ছে সংসদসর্বস্বতার যে রাজনীতির বিরোধিতা করে সংসদীয় গণতন্ত্রের ভোটব্যবস্থার সম্পর্কে মানুষকে মোহমুক্ত করার ভাবনা তৃতীয় শিবিরের সাধারণ রাজনৈতিক অবস্থান—সেই অবস্থানটাই হারিয়ে যাচ্ছে আজ নানা ‘তত্ত্বের’ আড়ালে—সিপিএম–এর বদলে তৃণমূলকে মানুষের সামনে দাঁড় করানো হচ্ছে মুক্তির রাস্তা হিসেবে, আর সবচেয়ে বড় সমস্যাটা হচ্ছে এখানেই।

আবার গোটা সমাজ জুড়ে সংসদীয় গণতন্ত্রের এই ভোট প্রক্রিয়া কে ঘিরে ব্যাপক জনগণের মোহ এবং স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহন বিদ্যমান আজও। এই অবস্থায় ভোটের প্রক্রিয়া থেকে বিরত থাকার মধ্যে দিয়ে আর পাঁচটা সামজিক-শিক্ষাগত ইস্যুতে আমাদের পাশে থাকা ছাত্রছাত্রী তথা সাধারণ মানুষ আসলে সমাজে চালু দ্বিত্ববিভাজনের রাজনীতির-ই শিকার হবেন। আবার উল্টোদিকে সক্রিয় ভোট বয়কট এর ডাকে জনগণ যে সাড়া আজকের সময়ে দেবেনা-এ সত্যিটা বাস্তবে দেখাই যাচ্ছে। তাই গত ৪০ বছরে বিপ্লবী শক্তিগুলোর একাংশের দ্বারা ভোট বয়কটের ডাক দিয়ে আসার পরেও দু একটা বিচ্ছিন্ন পকেটে আংশিক সাফল্য বাদে জনসাধারণের এডাকে সাড়া দেবার কোনো সাধারণ প্রবণতা নেই। আর মাওবাদীরা একদিকে ডাক দিচ্ছেন ভোট বয়কটের, অন্যদিকে তাদের নেতা  কিষেনজী (পার্টির অনুমোদনসহ) বলছেন—মমতাই যোগ্যতম মুখ্যমন্ত্রী। জঙ্গলমঙ্গলের কিয়দংশ বাদে বাকি জায়গায়, তারা ভোট নিয়ে নিস্পৃহ থাকছেন (‘ভোটবয়কট’ মানে কিন্তু এটা করা নয়), যাতে তারাও জানেন তাদের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন জনতাও আসলে গিয়ে তৃণমূলকে ভোট দেবে। তাই তারা তৃণমূল কংগ্রেস দলটিকে রাজনৈতিকভাবে আক্রমণ করছেন না— দু একটা প্রেস বিবৃতি বাদে। সংসদীয় গণতন্ত্র সম্পর্কে জনগণের মোহমুক্তির এ-কোন প্রক্রিয়া আমাদের জানা নেই। তাই এবারের নির্বাচনকে ঘিরে দ্বিত্ববিভাজনের রাজনীতির জোয়ারে ভেসে না গিয়ে, সংসদীয় গণতন্ত্রের মুখোশ উন্মোচনের জন্য সক্রিয় ভাবে জনগণের মধ্যে সচেতন প্রচারের কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন যে সমস্ত শক্তি, PDSF তাদের বিপ্লবী অভিনন্দন জানাচ্ছে।

pdsfleaflet2
pdsfleaflet